৩১৫০ কেভিএ ট্রান্সফরমার টেস্ট করার জন্য ক’দিন আগে বুয়েটের দুইজন অনেক সিনিয়র ও সম্মানিত অধ্যাপকের নেতৃত্বে একটি টীম আমাদের (পাওয়ারব্রীজ) ফ্যাক্টরীতে গিয়েছিলেন ।

 

ট্রান্সফরমারটি ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে নির্মিত একটি ব্যাংকের হেডকোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের জন্য আমরা বানিয়েছিলাম । বিল্ডিংয়ের ওভারঅল কনস্ট্রাকশন+ইন্টেরিয়রের কার্যাদেশ যে কোম্পানি পেয়েছিল তারা ৩১৫০ কেভিএ ট্রান্সফরমারটি আমাদের কাছ থেকে কিনেছে ।

 

এর পেছনে আবার আরেকটি গল্প আছে । প্রথমে তারা বাংলাদেশের অন্য কোনো একটি ট্রান্সফরমার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিকে অর্ডার দিয়েছিল । কিন্তু সেই ম্যানুফ্যাকচারার এর বানানো ট্রান্সফরমারটি বুয়েট-টেস্টে ফেইল করে, অর্থাৎ সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া যায়নি । যেহেতু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং তাদের কনসালট্যান্টের শর্ত ছিল বুয়েট-টেস্টে কুয়ালিফাই করতে হবে, তাই শেষ পর্যন্ত তারা আগে অর্ডার দেওয়া সেই ম্যানুফ্যাকচারারের বানানো ট্রান্সফরমারটি নিতে পারেনি ।

 

এরপর আমাদের কাছে এলো ক্লায়েন্ট । দামদর, পেমেন্ট-টার্মস সহ অন্যান্য কমার্শিয়াল আলোচনার পাশাপাশি ক্লায়েন্টের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল যে, বুয়েট-টেস্টে আমাদের বানানো ট্রান্সফরমার কুয়ালিফাই করতে হবে । যদি ফেইল করে তাহলে তারা ট্রান্সফরমার নিবে না, এ্যাডভান্স হিসেবে নেওয়া পেমেন্টটুকুও ফেরত দিতে হবে, সেভাবে এগ্রিমেন্ট হলো ।

 

এটা একটা রিস্কি চ্যালেন্জ । কারন, ৩১৫০ কেভিএ ক্যাপাসিটির একটা ট্রান্সফরমার বানানোর পরে যদি অর্ডার ক্যানসেল হয়, তাহলে অনেক টাকা আটকা পড়ে যাবে, লস হবে । আর তাছাড়া এটা তো একেবারে চাল-ডাল, খই-মুড়ি না যে যখন-তখন ওটা যে কোনো জায়গায় বিক্রি করে দেওয়া যাবে ।

 

যা হোক, সেই রিস্ক নিয়েই আমাদের টীম ট্রান্সফরমার বানানো শুরু করলো । আমি শুরুতেই আমাদের টীমমেম্বারদের ভয় দেখিয়ে বললাম, দেখো, যদি বুয়েট-টেস্টে ফেইল করে তাহলে ইনভেস্টমেন্ট তো নষ্ট হবেই, সাথে আমার মানইজ্জতও যাবে । কারন, বুয়েটের টীচারদের মধ্যে অনেকেই তা জানবে যাদের মধ্যে আমার সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দও যেমন আছেন, তেমনি আমার বন্ধু, ছোটো-বড় ভাইবোন অনেক শিক্ষক আছেন ।

 

অবশেষে এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ । তবে বুয়েট-টেস্টের জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন অর্থাৎ এপ্লিকেশন করা, ফিস্ জমা দেওয়া, বুয়েটের কাছ থেকে এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া, উনাদেরকে বুয়েট থেকে পিক করে আমাদের ফ্যাক্টরীতে নিয়ে যাওয়া – এই দায়িত্বগুলো ছিল আমাদের ক্লায়েন্টের যারা আমাদেরকে অর্ডার দিয়েছিল ।

 

অনেকেই হয়ত জানেন, বুয়েটের টেস্ট-ফিস্ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি বলে আজকাল অনেকে থার্ডপার্টি ইন্সপেকশনের বেলায় বুয়েটের পরিবর্তে ঢাকার কাছাকাছি হওয়াতে ডুয়েট বা এমআইএসটি থেকে টেস্টের ক্লজ যুক্ত করেন পারচেজ কন্ডিশনে । কিন্তু এই প্রোজেক্টের কর্তৃপক্ষ বোধহয় একটু বেশিই কনজার্ভেটিভ, তাদের বুয়েট-টেস্টই লাগবে ।

 

সাধারনতঃ ফ্যাক্টরীর প্রোডাকশন সংক্রান্ত ইস্যু টেককেয়ার করে আমার অন্য একজন বিজনেস পার্টনার; আমি বিজনেসের অন্য বিষয়গুলো দেখি । ঘটনাক্রমে সেইদিন সে ঢাকায় ছিল না, অনেক দূরবর্তী একটি শহরে ছিল তার একটি আনএ্যাভয়েডেবল ফ্যামিলি প্রোগ্রামে; আর ওইদিনই আমাদের ক্লায়েন্টের এপ্লিকেশনসাপেক্ষে বুয়েট থেকে শিডিউল দেওয়া হয়েছে ।

 

আমি আমার টীমমেম্বারদেরকে বললাম যে, কোনোভাবেই যেন আমাদের কারও কোনো আচরনে বুয়েটের স্যাররা বিন্দু পরিমানেও মাইন্ড না করেন, উনারা যে বিষয়টা যেভাবে দেখতে চাইবেন, সেটা সেভাবেই দেখাতে হবে, কোনো রকমের পন্ডিতি বা মাতব্বরি টাইপের জ্ঞান জাহির করা যাবে না বুয়েটের স্যারদের সামনে কোনো কিছুর বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য । কোনো বিষয়ে যদি উনারা কোন এডভাইস বা ফাইন্ডিংস দেন, তাহলে হাসিমুখে বিনয়ের সাথে তা মেনে নিতে হবে, কোনোরকম আঁতলামিমার্কা বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে না ।

 

টেস্ট চলাকালীন বুয়েটের সম্মানিত প্রফেসরবৃন্দ যখন আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারলেন যে, এই কোম্পানির চেয়ারম্যান বুয়েট গ্র্যাজুয়েট, তখন উনারা আমি কোন ব্যাচের তা জানতে চাইলেন । তখন আমাদের কোনো না কোনো ইন্জিনিয়ার বুয়েটে আমার ব্যাচের EEE এর দুই/একজন শিক্ষকের নাম বলে উনাদেরকে বলেছিল যে, আমাদের চেয়ারম্যান স্যার উনাদের ব্যাচের । তখন একজন স্যার আমার সহকর্মীদের বললেন যে, তাহলে প্রথমদিকে তো আমি ওদেরকে পড়িয়েছি ।

 

হ্যাঁ, আমরা যখন ১৯৯৪ সালের জুন মাসে ক্লাস শুরু করেছিলাম, তার কয়েকদিন আগে উনি পাস করে লেকচারার হিসেবে মাত্র জয়েন করেই লেভেল ১, টার্ম ১ এ আমাদের ইলেকট্রিক্যালের ক্লাস নিয়েছিলেন । বাই দা ওয়ে, এবার পবিত্র হজ্জব্রত পালন করে সৌদিআরব থেকে ১ দিন আগে দেশে ফিরেই স্যার সেদিন চলে গেছেন বুয়েট থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে আমাদের ফ্যাক্টরীতে ট্রান্সফরমার টেস্ট করতে ।

 

খুব সাদামাটা কিন্তু সিরিয়াস টাইপের শিক্ষক ছিলেন তিনি । যতদূর মনে পড়ে, উনার সাবজেক্টে বোধহয় আমি A গ্রেড পেয়েছিলাম যদিও ওভারঅল টার্মে A- (A minus) পেয়েছিলাম (৩.৫৭) । মেকানিক্যালে ৩.৫৭ খুব একটা খারাপ জিপিএ ছিল না; মানে তখনো আমি বুয়েটের তুলনামূলক খারাপ ছাত্রদের তালিকায় নাম লেখাই নাই ।

 

এরপর পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় অনেক জল বয়ে গেল, আমিও দিনেদিনে বারভেজাইল্যা কাজ যেমন, ডিবেট, আবৃত্তি, বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন আর ”বুয়েট থেকে টিএসসি” করতে করতে, বুয়েটের বাহিরে বিভিন্ন রকমের বাউন্ডুলে-মার্কা ঘুরাঘুরি করতে করতে, আর বিশেষ আরেকটি কারনে শেষ পর্যন্ত পাস করে বের হওয়ার সময় তুলনামূলক খারাপ ছাত্রদের তালিকায় নিজের নাম লিখেছিলাম যদিও আবার ফাইনাল টার্মের রেজাল্ট বের হওয়ার অনেক আগেই বুয়েটের আমাদের পুরো ব্যাচের মধ্যে সবচাইতে প্রথম ৩ জন কর্মজীবীর তালিকায় আমরা ৩ বন্ধু একসাথে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলাম ।

 

জীবন আসলেই অদ্ভুৎ, বড়ই অমসৃন; কোথাও উঁচু তো কোথাও নিচু !

 

উনার সাথে আরেকজন প্রফেসর যিনি গিয়েছিলেন সেদিন, তিনি বোধহয় উনার চাইতে ২/১ ব্যাচ জুনিয়র হবেন ।

 

বুয়েটে আমার সরাসরি ক্লাস নেওয়া শিক্ষক আমার ফ্যাক্টরীতে গিয়েছেন শুনে আমার বুক তো আরও দুরুদুরু, শেষ পর্যন্ত উনাদের টেস্টে আমাদের বানানো ট্রান্সফরমার সকল টেস্টিং প্যারামিটারে কুয়ালিফাই করে কি-না সেই দুশ্চিন্তায় ।

 

আমাদের টীমের কয়েকজন আমাকে জানালো যে, স্যাররা তো খুবই সিরিয়াস, নিজের হাতে সব কিছু টেস্ট করছেন উনাদের টীমে ফোরম্যান/টেকনিশিয়ান টাইপের সদস্য থাকা সত্ত্বেও । কোনো এক পর্যায়ে ট্রান্সফরমারের উপরের দিকে কিছু একটা দেখার জন্য একটি চেয়ার দেওয়া হলো । স্যার চেয়ারের উপরে উঠলেন, পারলে পারে উনি লাফ দিয়ে ট্রান্সফরমারের উপরে উঠে পড়েন, এমন একটা অবস্হা । আমাদের লোকজন তো পুরোই অবাক উনাদের সিরিয়াসনেস ও একটিভনেস দেখে ।

 

কারন, সরকারি অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ ফ্যাক্টরী ভিজিটে গেলে তাদের এসিস্ট্যান্ট ইন্জিনিয়ার লেভেলের লোকজনও পকেটে হাত দিয়ে সাহেবের মতো ঘুরে আর চোখ দিয়ে দেখে, ফিজিক্যাল কাজকর্ম সব করায় টেকনিশিয়ান, ফোরম্যানদেরকে দিয়ে ।

 

আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে এগুলো শুনে আমি তখন মনেমনে ভয় পেলেও আমার আলমা-ম্যাটারের অহংকারে আহলাদিত হয়ে তাদেরকে বললাম যে, এইজন্যই তো ওইটার নাম বুয়েট আর “বুয়েটে টেস্টকৃত” বলে সিমেন্ট, রড-সহ বিভিন্ন কনস্ট্রাকশান প্রোডাক্টের বড় বড় ম্যানুফ্যাকচারাররা তাদের এ্যাড বানিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে তা লাখ-লাখ টাকা খরচ করে প্রচার করে প্রতিদিন ।

 

আরও বললাম, দেখো, আমার স্যার বুয়েট থেকে পাস করে এখন থেকে কমপক্ষে ২৫-২৬ বছর আগে ইউরোপ/আম্রিকা থেকে পিএইচডি করে এসেছেন, এখন থেকে হয়ত প্রায় ১৭/১৮ বছর আগে এসোসিয়েট প্রফেসর থেকে পদোন্নতি পেয়ে প্রফেসর হয়েছেন, এত সিনিয়র মানুষ, তারপরও নিজস্ব দায়িত্ব সততার সাথে যথাযথভাবে পালনের দায়বদ্ধতার বিষয়টিতে উনারা কতখানি সিরিয়াস ! সাথে টেকনিশিয়ান, ফোরম্যান থাকা সত্ত্বেও এই পজিশনে এবং বয়সেও উনারা নিজের হাতে সবকিছু চেক করছেন, চেয়ারের উপরে দাঁড়িয়ে যা দেখার তা তো দেখছেনই, পারলে পারে এক লাফে ট্রান্সফরমারের উপরে উঠে যান ।

 

যা হোক, শেষ পর্যন্ত আমাদের বানানো ৩১৫০ কেভিএ ট্রান্সফরমার বুয়েটের দুইজন সিনিয়র সম্মানিত প্রফেসরের নেতৃত্বাধীন টীমের টেস্টে উত্তীর্ণ হয় ।

 

মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজার শুকরিয়া । আমাদের ইনভেস্টমেন্টও নষ্ট হয় নাই, আবার স্যারদের কাছে উনাদের ছাত্রের মানইজ্জতও নষ্ট হয় নাই ।

 

আনোয়ার পারভেজ শেফীন

চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ